বর্তমান সাইবার আইন সরকারের জন্য আত্মঘাতী: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন দিয়ে অপতথ্য ও সাইবার অপরাধ ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তাঁর মতে, অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন বর্তমান কাঠামোয় পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে। একই সঙ্গে সরকারের জন্যও বুমেরাং হতে পারে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রস্তাবিত আইন নিয়ে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন ও সম্প্রতি গঠিত গণমাধ্যম কমিটির প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জনকারী দেশগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে গুরুত্ব দিয়েছে। অপতথ্য ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলোর আর্থিক মুনাফার সম্পর্ক রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর অভিযোগ, ব্যবসায়িক স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্যকে বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ও যৌক্তিক আলোচনা নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রযুক্তি ব্যবসার আঁতাতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ অবস্থায় প্ল্যাটফর্মের দায় নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর কঠোর বিধান চাপানো টেকসই সমাধান নয়।

আলোচনায় ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। রামুতে বৌদ্ধপল্লিতে হামলা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং সংঘবদ্ধ হামলার বিভিন্ন ঘটনায় ফেসবুকের অপব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, প্ল্যাটফর্মটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

শফিকুল আলম জানান, প্রস্তাবিত আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে না রাখা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার ঠেকানো এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে।

পাশাপাশি অনলাইনে চরিত্রহনন ও মিথ্যা প্রচারণা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। মানহানির প্রতিকার ফৌজদারি আইনের পরিবর্তে দেওয়ানি আইনে এনে ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক জরিমানার বিধান রাখার পরামর্শ দেন শফিকুল আলম।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টার ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হলে একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিপর্যস্ত হতে পারে। একজনের অপরাধের কারণে পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরেন তিনি।

শহীদুল ইসলাম বলেন, মানহানির মতো বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা প্রয়োজন। তৃণমূলের সংবাদকর্মীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু প্রস্তাবিত আইনে দায়মুক্তির বিধান, অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লক করার প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা নিয়ে আপত্তি জানান। সাংবাদিকতা ও মূলধারার গণমাধ্যমকে আইনের অপপ্রয়োগ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান চান তিনি।

জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রস্তাবিত কাঠামোয় নির্বাহী বিভাগের প্রাধান্যের সমালোচনা করে শরীফুজ্জামান পিন্টু বলেন, এতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব ও ভারসাম্য প্রয়োজন। কাউন্সিলের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্য হিসেবে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

সমাপনী বক্তব্যে ইফতেখারুজ্জামান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষায় নাগরিক সমাজ এবং সংবাদকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত আইনের নিবর্তনমূলক ধারা বাতিল ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর