কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ সেন্টিমিটার পানি কমেছে। এতে বন্যাকবলিতদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের অন্তত ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অথচ সরকারি বরাদ্দের ত্রাণ সহায়তা চাল ও শুকনা খাবার দু’দিনে মাত্র ৮ হাজার পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে। আর ত্রাণ সহায়তার আওতার বাইরে রয়ে যাচ্ছে বিপুল সংখ্যক পানিবন্দি পরিবার। গতকাল চিলামারী ইউনিয়নের বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন এমপি বাচ্চু মোল্লা। এদিকে বন্যার পানিতে বসতভিটা, রাস্তাঘাট, ফসল ও আবাদি জমি তলিয়ে যাওয়ায় চরবাসির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারের ঘরের ভেতরে পানি টলমল করায় মাচা করে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। আবার কেউ উঁচু স্থানে বা নৌকায় আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে অন্যত্রও চলে গেছে, পানি কমলে তারা ফিরবে। এসময় জরুরি প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার প্রধান অবলম্বন এখন ছোট ডিঙ্গি নৌকা। তবে পানি কমতে শুরু করলেও দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি আগের মতই রয়েছে। দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় নলকূপ ও অন্যান্য পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। এতে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বন্যাকবলিতরা। পাশাপাশি তাদের জ্বর, সর্দি-কাশি, চর্মরোগ, চোখের সমস্যা ও বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি ৫ সেন্টিমিটার কমেছে (১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা পর্যন্ত)। আপাতত নতুন করে পানি বাড়ার আশঙ্কা নেই। গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ১৩ দশমিক ০১ মিটার। ওই পয়েন্টে বিপদসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১৮ টন চাল এবং শুকনা খাবারের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে বরাদ্দের চাল ১০ কেজি করে ১ হাজার ৮০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে ২ লাখ টাকার শুকনা খাবার দেওয়া হচ্ছে আরও ২৫০টি পরিবারকে। গতকাল সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি আলহাজ্ব রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা চিলামারী ইউনিয়নের বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। সরকারী বরাদ্দের বাইরেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে বন্যার্ত দরিদ্রদের মাঝে আর্থিক সহায়তা দিয়েনে। সারিবদ্ধ হয়ে অসংখ্য নারী-পুরুষ এ অর্থ গ্রহণ করেছেন। এসময় দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিন্দ্য গুহ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শুভাগত বিশ্বাস ও দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহীদ সরকার মঙ্গল, দৌলতপুর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদুজ্জামান রুবেলসহ স্থানীয় বিএনপি দলীয় নেতৃবৃন্দ ত্রাণ বিতরণে অংশ নেন। অপরদিকে গতকাল সোমবার দুপুরে বন্যায় কৃষকদের তলিয়ে যাওয়া ফসলের মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, চিলমারী, রামকৃষ্ণপুর, ফিলিপনগর, মরিচা, প্রাগপুর ও হোগলবাড়ীয়া ইউনিয়নে ১ হাজার ৫০ দশমিক ১৩ হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৮৩ হেক্টর মরিচ, ২২৮ হেক্টর কলা, ৩৩ হেক্টর সবজি, ৬২ হেক্টর আমন ধান, ২৩ হেক্টর মাসকলাই, ২১২ হেক্টর বীজ পাট, ২০৩ হেক্টর গোখাদ্য, ৬ হেক্টর ফলের বাগান এবং দশমিক ১৩ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা। পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা সরকারি প্রণোদনার আওতায় যাতে আসে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। বন্যার পানি দ্রুত কমে পানিবন্দি মানুষ নিরাপদ হবে এমন প্রত্যাশা সবার।