লালনের গান, সুরের ধারা এবং শফি মণ্ডলের অবদান

ইকরামুল হক ইহান

লালন শাহ শুধু একজন গীতিকারই নন, একজন ভাবুক দার্শনিক, সাধক, সুরকার এবং গায়কও ছিলেন। তাঁর গান ছিল সাধনার অংশ; তাই তিনি সাধারণ অর্থে বসে কাগজে-কলমে গান লিখতেন না। যখন তাঁর অন্তরে ভাব বা আধ্যাত্মিক অনুভব জাগ্রত হতো, তখন তিনি তা শিষ্য ও ভক্তদের সামনে প্রকাশ করতেন এটা অস্বিকার করা যায় না তবে সব গান ও সুর গুছিয়ে রেখে গেছেন তাও না। লালনের পান্ডলিপিকে সংরক্ষন করা হয়েছে তাও শত বছর পরে মুখে মুখে। গবেষকদের মতে, লালন হাজার হাজার গান রচনা করেছিলেন; তবে বর্তমানে প্রায় ৮০০টির মতো গানকে তুলনামূলক ভাবে প্রামাণ্য হিসেবে ধরা হয়। লালনের জীবদ্দশায় তাঁর গান কোনো আনুষ্ঠানিক স্বরলিপিতেও সংরক্ষিত ছিলনা। সে সময় অধিকাংশ শিষ্যই নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত ছিলেন। ফলে তাঁর গান, সুর ও দর্শন গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মুখে মুখে প্রচারিত হয়।

১৯৭০-এর দশক থেকে বাংলাদেশে লালনের গান নতুনভাবে আলোচনায় আসে এবং বেতার, টেলিভিশন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিয়মিত পরিবেশিত হতে শুরু করে। ১৯৮০-এর দশকে কুষ্টিয়ার কৃতী শিল্পী ফরিদা পারভীন লালনগীতিকে সারা বাংলাদেশে এবং পরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি বিভিন্ন আখড়া, প্রবীণ বাউল ও লালন-অনুসারীদের কাছ থেকে প্রায় ৩০টি গান সংগ্রহ করে সেগুলো ক্যাসেট আকারে রেকর্ড করেন। আশির ও নব্বইয়ের দশকে তাঁর কণ্ঠে প্রকাশিত বহু ক্যাসেট লালনগীতিকে গ্রাম থেকে শহর, এমনকি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেয়। তাঁর গাওয়া ও লালনের সুর করা গানগুলো হলো ঃ- খাঁচার ভিতর অচিন পাখি , মিলন হবে কত দিনে , সময় গেলে সাধন হবে না , জাত গেল জাত গেল বলে , বাড়ির কাছে আরশিনগর , আমি একদিনও না দেখিলাম তারে , তিন পাগলে হলো মেলা , বেঁধেছে এমন ঘর , মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার , প্রেম লয়ে যাও আমায় , লালন কয় জাতির কী রূপ ,ও সে বাজায় বাঁশি , একটা বদ হাওয়া , রূপ কাঠের এই নৌকাখানি , সত্য বলো সুপথে চলো , আমি ওপার হয়ে বসে আছি , পাবে সামান্যে কি তার দেখা , হতে চাও হুজুরের দাসী , পরগা নামাজ জেনে শুনে , কেগো জানতে পায় ,মওলা বলে , আপন ঘরের খবর নে না , যেখানে সাঁই বারামখানা , অবোধ মন তোরে , ধন্য ধন্য বলি তারে , বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল , গেড়ে গাঙের খ্যাপা , মন সহজে কি সই হবে ও শুনলে প্রাণ চমকে ওঠে । অসংখ্য গান আজ লালনগীতির পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছে। ২০০০ সালের পর থেকে দেশের আধুনিক গানের পাশাপাশি লালনের গান প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধি পাই । সাধারণ মানুষকে চমক দেয় ভিন্ন রকমের কিছু লালনের গান, সৃষ্টি হয় নতুন কিছু গান । যেমন কানার হাট বাজার, এমন মানব জনম আর কি হবে, নবীর ডঙ্কা , কাম গোপন প্রেম গোপন, না জানি কোন দশা হয়, কারে বলবো মনের কথা , আল্লাহ বলো মনরে পাখি, চলো যাই আনন্দেরই বাজারে এমন নতুন নতুন অনেক গান যা শত শত গান সাধুরা গেয়ে থাকেন কিংবা শিল্পীরা গবেষণা করছেন। হঠাৎ করে কোথায় থেকে আসলো এই সব গানের সুর ? মাটির সুর যা আমরা ভাব সংগীত নামে গেয়ে থাকি ? তবে কি লালনের ১৫০ বছর আগে সুর ধারন করা ছিল ? তখন কি শিল্পী ছিল না ? হ্যাঁ শিল্পী ছিল কিন্তু কিছু পরিচিত গান ছাড়া সুর করা গান ছিল না। প্রায়াত শিল্পী ফরিদা পারভিন কিছু গান বার বার রেকর্ড করে গেছেন যা তিনি বিভিন্ন লালন ভক্তের কাছে থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। তাছাড়া যত গান শুনি প্রায় গানই শফি মন্ডল এর সুর করা এতে কোন সন্দেহ নেই। শফি মন্ডল প্রথমত একজন সংগীত গুরু ও ওস্তাদ । অসংখ্য ছাত্র/ছাত্রী আছেন অনেক ছাত্র/ছাত্রীকে লালন সংগীত শুদ্ধ ভাবে শিখিয়েছেন । শফি মন্ডল লালন চর্চা করতে করতে তিনি লালনের বাণী হৃদয়ে ধারন করেছেন যা লালনের বাণীকে নিজের ভাব দিয়ে প্রচার করছেন বিশ্ব দরবারে । এর দলিল খুঁজতে চান ? তার শিকড়ে যান অবশ্যই পাবেন । ফরিদা পারভিন এর কন্ঠের গান ছাড়া ২০০০ সালের আগের কোন লালনগীতির সুর করা গান পাবেন না। শফি মন্ডলের একেকটি ভক্ত একেকটি দলিল । শফি মন্ডল সুর করে তার ভক্তদের কন্ঠে তুলে দিয়েছেন । জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে গত ২৯.০৬.২০২৬ শুরু হয়েছে লালন গানের কর্মশালা সেখানেও ৩টি গান শিখানো হয় শফি মন্ডল এর সুরে। আরো পিছনে যাই শফি মন্ডল যখন শিল্পী তৈরীর কারখানা খুলে বসেছিলেন তখন সেই কুষ্টিয়া দৌলতপুরের হোসেনাবাদ গ্রামে বসে লালনের বাণীতে সুর বেঁধেছিলেন – “এসব দেখি কাঁনার হাটবাজর” যা প্রথম ২০০০ সালে দিকে একুশে টেলিভিশনের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান বাউলীয়ানাই সর্ব প্রথম শফি মন্ডল গেয়েছিলেন তারপর গানটি ক্লোজআপ খ্যাত রিংকুর মাধ্যমে সারা দেশে আলোড়ন করে। এমন শত শত গান সুর করে নিজে গেয়েছেন সেই সাথে তার ছাত্র/ছাত্রী কন্ঠে তুলেছেন। ২০০৭ সালে একুশের টেলিভিশন প্রযোজিত সিনেমা ও শাহরিয়ার কল্লোল পরিচালিত “অন্ধনিরঙ্গম” সেখানে লালনের একটি গান ব্যবহার করেছেন যা সুর দিয়েছেন শফি মন্ডল “চলো যাই আনন্দের বাজারে” সে গানটিও জনপ্রিয় । এমন অনেক গানের সুর দিয়েছেন সংগীত পিপাসুদের অগচরে হয়তো একটু অবাক হওয়ার বিষয়। হয়তো অনেকের মানতে বা ভাবতে কষ্ট লাগছে। তবুও সাধক সাধনায় মগ্ন থাকবে এটাই কাম্য। সব শেষে বলতে চাই যে লালন গানের সুরের বিকাশ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করার ক্ষেত্রে বহু শিল্পী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আসলেও ফরিদা পারভীন যেমন লালনগীতিকে বিশ্বপরিচিত করেছেন, তেমনি শফি মণ্ডলও বহু গানের নতুনত্ব দিয়ে ধারাকে লালনচর্চার ভেতরে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন—এমন মূল্যায়ন তাঁর শিষ্য, ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ